ব্রেকিং

x

ক্যানসারে বাবা-ভাইয়ের মৃত্যু, অসুস্থ মা ও সন্তানসম্ভবা স্ত্রী—অভাবের সংসার চালাতে কসবা বাজারে ছোট্ট দোকানই ভরসা

বাবা-ভাইকে হারিয়ে নিঃস্ব, তবু ভিক্ষা নয়—নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান আরিফ

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১৯ পিএম

বাবা-ভাইকে হারিয়ে নিঃস্ব, তবু ভিক্ষা নয়—নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান আরিফ

বাবা নেই, ছোট ভাইও নেই। দুজনকেই কেড়ে নিয়েছে ক্যানসার। অর্থাভাবে বন্ধ হয়েছে পড়াশোনা। ঘরে অসুস্থ মা, স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ভিক্ষার পথ বেছে নেননি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার আরিফ।


কসবা বাজারে ছোট্ট একটি দোকানে মোবাইলের সরঞ্জাম বিক্রি ও মানুষের ওজন মেপে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। সামান্য পুঁজি পেলে ব্যবসা বড় করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চান তিনি।


‘ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবা’—কটাক্ষেও দমেননি

আরিফকে অনেকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবা?’ কিন্তু মানুষের কাছে হাত পাততে নারাজ তিনি। নিজের শ্রমে উপার্জন করে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চান।

ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে শুরু জীবনসংগ্রাম

কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে আরিফ। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও আর্থিক সংকট ও পারিবারিক শোকের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।

২০২০ সালে একটি ছোট ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে উপার্জন শুরু করেন তিনি। পরে কসবা বাজারে একটি ছোট স্টলে মোবাইলের কাভার, হেডফোন, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি শুরু করেন। পাশাপাশি পথচারীদের ওজন মেপেও কিছু টাকা আয় করেন।

চাহিদা আছে, নেই ব্যবসা বাড়ানোর পুঁজি

আরিফের দোকানে পণ্যের চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে প্রয়োজনীয় মালামাল কিনতে পারেন না। ফলে বাড়ছে না বিক্রি, বড় হচ্ছে না ব্যবসাও।

একদিকে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা, অন্যদিকে সংসারের খরচ। এর মধ্যে স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হওয়ায় অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

‘দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন’

ক্রেতা ফয়েজুর রহমান বলেন, ‘আমি আরিফের কাছ থেকে একটি মানিব্যাগ কিনেছি। ফুটপাতে এরকম ভালো জিনিস সচরাচর পাওয়া যায় না। জিনিস খুব ভালো। আরিফ এখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে। আমরা চাই, সরকারিভাবে যেন তাকে সহায়তা দেওয়া হয়।’

আরেক ক্রেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, ‘তার বাবা নেই, মা আছেন। সঙ্গে তার পরিবারও আছে। সে ইচ্ছা করলেই মানুষের কাছে হাত পাততে পারতেন, কিন্তু সেটা না করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।’

আরিফের দীর্ঘদিনের এক সহকর্মী ব্যবসায়ী জানান, প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি আরিফের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। আরিফ মোটামুটি শিক্ষিত। সরকার তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করলে তিনি পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, ‘আরিফ একজন প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে নিজের শ্রমের বিনিময়ে হালালভাবে উপার্জন করে যাচ্ছে। সরকার তাকে সহায়তা করলে ব্যবসাটাকে আরেকটু উন্নত করতে পারত।’

সরকারি সহায়তার আবেদন আরিফের

নিজের সংগ্রামের কথা জানিয়ে আরিফ বলেন, ‘আমি কসবা বাজারে ২০২০ সাল থেকে ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে ছোট্ট একটি ওজন মাপার মেশিন দিয়ে শুরু করি। পরে পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করি। আমার পরিবার দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত। তাই সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসাটি শুরু করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘পণ্যের চাহিদা থাকলেও নানা আর্থিক সংকটের কারণে ব্যবসাটি সেভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই সহযোগিতা করেছেন, তবে সরকারিভাবে এখনো কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমি সরকার ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের কাছে আবেদন করছি, আমার এই ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য সামান্য কিছু হলেও অনুদান দিন। আমার মা অসুস্থ এবং স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা।’

ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল আরিফের। কিন্তু ছোট ভাইয়ের মৃত্যু, বাবাকে হারানোর শোক ও আর্থিক সংকটে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি। ২০২৪ সালে তার বাবা ক্যানসারে মারা যান।

ভিক্ষার পথ বেছে না নেওয়ার কারণ জানিয়ে আরিফ বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। অনেকেই ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া তুমি আর কী করতে পারবা? তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি হালালভাবে ব্যবসা করে, পরিশ্রম করে আয় করার।’

সামান্য পুঁজিতেই বদলাতে পারে আরিফের জীবন

আরিফের স্বপ্ন, প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে বিক্রি বাড়ানো এবং ছোট্ট দোকানটি বড় করা। সামান্য পুঁজি কিংবা সরকারি সহায়তা পেলে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালানো সহজ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

কসবা উপজেলা মার্কেটের পশ্চিম কোণে ছোট্ট দোকানে প্রতিদিন জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আরিফ। প্রিয়জন হারানোর শোক কিংবা অভাব—কোনোটিই তাকে পরিশ্রমের পথ থেকে সরাতে পারেনি।

মানুষের কাছে হাত পেতে নয়, নিজের শ্রমে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চান আরিফ। তার এই লড়াই এগিয়ে নিতে এখন প্রয়োজন সামান্য পুঁজি, কর্মসংস্থানের সুযোগ ও মানবিক সহযোগিতা।

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!