ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরে একটি চায়ের দোকান ঘিরে গড়ে উঠেছে ভিন্নধর্মী এক আকর্ষণ। ‘আশিক টি শপ’-এ মিলছে প্রায় ২৬০ ধরনের চা, যার স্বাদ নিতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা চা-প্রেমীরা। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন দোকানটির উদ্যোক্তা আশিক মিয়া।
সাধারণ দুধ চা কিংবা লিকার চায়ের গণ্ডি পেরিয়ে মশলা, ফল, বাদাম, তেঁতুল, ভেষজসহ নানা উপাদানে তৈরি বিভিন্ন স্বাদের চা পরিবেশন করে ইতোমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি। সরাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাশাপাশি সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও দর্শনার্থীরা তার দোকানে আসেন। এমনকি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাসের অনেক যাত্রীও এখানে নেমে চায়ের স্বাদ নেন।
দোকানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সুসজ্জিত বসার ব্যবস্থা এবং দেয়ালে টাঙানো ২৬০ ধরনের চা ও কফির মূল্যতালিকা। বর্তমানে দোকানটিতে কয়েকজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানও হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ জন ক্রেতা ও দর্শনার্থী আসেন এবং দৈনিক বিক্রি হয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
সবচেয়ে জনপ্রিয় চায়ের মধ্যে রয়েছে শাহী মালাই, চকলেট মালাই, সাধারণ মালাই, বাদামি চা, তুর্কি চা, ডায়াবেটিক চা, রোজেলা, মাল্টা, তেঁতুল ও মসলা চা। এছাড়া বুলেট কফি ও তুর্কি ব্ল্যাক কফিও ক্রেতাদের কাছে বেশ সমাদৃত।
আশিক জানান, ইউটিউব থেকেই তিনি চা তৈরির বিভিন্ন দেশি-বিদেশি রেসিপি সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। দীর্ঘদিন চর্চা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে একের পর এক নতুন স্বাদের চা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই চায়ের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে নতুন নতুন রেসিপি শিখেছি। চেষ্টা করেছি সেগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে। আজ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ শুধু আমার চা খেতেই আসেন—এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
আশিক টি শপের যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে শাহবাজপুরের দ্বিতীয় গেট এলাকায়। পরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়নকাজে দোকান উচ্ছেদ হওয়ায় ২০২৩ সালে প্রথম গেট সংলগ্ন বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়।
দোকানে প্রতি কাপ চায়ের দাম ১০ থেকে ১০০ টাকা, আর কফির দাম সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। মূল্যতালিকা অনুযায়ী, শাহী মালাই চা ১০০ টাকা, চকলেট মালাই ৮০ টাকা, সাধারণ মালাই ৬০ টাকা, রোজেলা ৫০ টাকা, তেঁতুল ও লেমন-মাল্টা চা ৪০ টাকা এবং মসলা চা ২০ টাকা। তুর্কি ব্ল্যাক কফির দাম ১৫০ টাকা।
শুক্র ও শনিবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে উপচে পড়া ভিড় থাকে। উৎসব-পার্বণে অনেক সময় বসার জায়গাও পাওয়া যায় না। ফলে দোকানটি শুধু চায়ের দোকান নয়, বরং বন্ধু-স্বজনদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
আশিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের প্রয়াত আলী হায়দার মিয়ার ছেলে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে ব্যবসায় নামেন। বর্তমানে মা, স্ত্রী, এক কন্যাসন্তান, পাঁচ বোন ও দুই ভাইকে নিয়ে তার পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরেছে।
এক সন্ধ্যায় দোকান পরিদর্শনে এসে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, স্থানীয় এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগগুলোকে টেকসই করতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে।
শাহবাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আইয়ুবুর রহমান বলেন, “আশিকের চা এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়িয়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলার মানুষের কাছে পরিচিত। বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের জন্যও আমরা এই স্থানটি বেছে নিই।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মালেক বলেন, “প্রতিদিন বিকেল ও সন্ধ্যায় শত শত মানুষের উপস্থিতিতে এখানে এক প্রাণবন্ত মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি হয়।”
শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মনির হোসেন বলেন, “আশিক একজন সফল উদ্যোক্তা। তার সাফল্য অন্য তরুণদেরও উদ্যোক্তা হতে অনুপ্রাণিত করবে।”
আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।
Development by: webnewsdesign.com