একটি গাড়িতে করে করে এলেন ১০-১৫ জনের মতো। তড়িঘড়ি করে কয়েকজন নেমে একজন নারীকে নামানোয় ব্যস্ত। এরপর হাত ধরে নিয়ে একটি কার্যালয়ে বসার ব্যবস্থা করলেন। ওই নারীকে ঘিরেই সবার আলাপচারিতা। বার্ধক্যজনিত কারণে কম শুনেন বলে হয়তো কথাগুলো অবশ্য তাঁর কানে পৌঁছায় না। তিনি সাজেদা বেগম। একজন সফল জননী । ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ এর আওতায় ‘সফল জননী নারী’ হিসেবে তিনি মনোনীত হয়েছেন। সোমবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গনে তিনি পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে এসেছিলেন পুরস্কার নিতে।
আখাউড়া পৌর এলাকার দেবগ্রামের প্রয়াত আলী আকবর চৌধুরীর স্ত্রী সাজেদা বেগমের সঙ্গে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরুর আগে কথা হয় কালের কণ্ঠের এ প্রতিবেদকের। দু’দফায় মিনিট বিশেকের আলোচনায় উঠে আসে জীবন চলার হৃদয় ছোঁয়া অনেক কথা। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও যোগ দেন এ আলাপচারিতায়। আট সন্তানের জননী সাজেদা বেগম। ছয় ছেলে, দুই মেয়ে তাঁর। পড়ালেখায় সবাইকে শিক্ষিত করার পাশাপাশি তাঁদেরকে মানুষ করতে পেরেছেন বলেও দাবি করেন সাজেদা বেগম। আর এতেই যেন তাঁর সুখের শেষ নেই বলে তিনি জানালেন। সন্তানদেরকে মানুষ করতে অন্যের প্রতিও পরামর্শ দেন ৭২ বছর বয়সি ওই নারী।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাজেদা বেগমের আট সন্তানের সবাই মাস্টার্স পাস। বড় ছেলে জাকির চৌধুরী অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স পাশ করে বর্তমানে সৌদি আরবে চিফ আন্ডার রাইটার হিসেবে একটি কম্পানিতে কর্মরত আছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করা দ্বিতীয় ছেলে ইসহাক চৌধুরী জনতা ব্যাংকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। একই বিশ^বিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করা তৃতীয় ছেলে ইলিয়াস চৌধুরী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কানাডায় কর্মরত আছেন। চতুর্থ ছেলে কাউছার চৌধুরী একজন চিকিৎসক। তিনি ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজে সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাশ করা পঞ্চম ছেলে ফারুক চৌধুরী রিয়াদে একটি কম্পানিতে ম্যানেজার (সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট) হিসেবে কর্মরত। সবার ছোট ছেলে ইসমাইল চৌধুরী শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর এখন কর্মকরত আছেন জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে। মাস্টার্স পাশ বড় মেয়ে আয়েশা খাতুন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। মাস্টার্স পাশ করা ছোট মেয়ে রাবেয়া বেগম গুলশান মহিলা কলেজের লেকচারার।
১৯৫২ সালের ১২ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার চান্দি গ্রামে সাজেদা বেগমের জন্ম। নিজের পড়াশুনা বেশি দূর এগোয়নি, এস.এস.সি পাশ। বিয়ের পর থেকেই ছিলো টানাপোড়েনের সংসার। বড় ছেলের এস.এস.সি পরীক্ষার সময় প্রবাসে পাড়ি জমান স্বামী আলী আকবর চৌধুরী। এরপর থেকে একাই সংসাসের হাল ধরেন সাজেদা বেগম।
কথা হলে বলেন, ‘বড় ছেলে জাকির ছিলো পড়াশুনায় ভালো। তার দেখাদেখি অন্যরাও উৎসাৎ পেতো। জাকিরও তার ছোট ভাইবোনদেরকে দেখে রাখতো। পড়ার জন্য বলতো। একটা সময় যার যার তাগাদা অনুযায়ি পড়াশুনা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানদের লালন-পালন করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিলো তাদের খুব বেশি চাহিদা ছিলো না। পড়াশুনার বাইরে অন্য বিষয় নিয়ে বিরক্ত করতো না। যখন যেটা বলতাম তারা শুনতো। কথার অবাধ্য হতো না।’
সন্তানদের লালন-পালন করেছেন আর এখন সন্তানরা আপনাকে দেখাশুনা করছে- সময়ের পার্থক্যে কেমন আছে জানতে চাইলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে হেসে বলেন, ‘এখনো তারা আমার কথা শুনে। আমাকে বেশ ভালো রেখেছে সন্তানেরা। পাঁচবার ওমরাহ হজ করিয়েছে। আবার করাবে। নাতি-নাতিন নিয়ে আমি বেশ আনন্দে দিন কাটাই।’
তিনি বলেন, ‘সন্তানদেরকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলা সব বাবা-মায়েরই দায়িত্ব। এজন্য কষ্ট হলেও মেনে নিতে হবে। সন্তানদেরকে কষ্ট করে মানুষ করতে পারার আনন্দের চেয়ে বড় আর কি হতে পারে। এ বয়সে এসে শারিরিক অনেক কষ্ট ভোগ করতে হলেও সন্তানদের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে যাই।’ সফল মা হিসেবে পুরস্কার পেয়ে বেশ ভালো লাগছে বলে জানান তিনি।
আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।
Development by: webnewsdesign.com