ব্রেকিং

x

মাছ ধরতেও যেখানে গুনতে হয় চাঁদা!

বৃহস্পতিবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ | ১১:১৩ অপরাহ্ণ

মাছ ধরতেও যেখানে গুনতে হয় চাঁদা!

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের দাসপাড়ায় বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে থাকেন। ওই ইউনিয়ন ও পাশের গোয়ালনগর ইউনিয়নের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে লঙ্গন নদী। এ নদীর শাখা বাক-লঙ্গন। নাসিরনগর উপজেলা সদর থেকে প্রবাহিত হয়ে গোয়ালনগর ইউনিয়নের বিল আটউড়িতে মিলেছে এই নদী। এখানেই মাছ ধরতে গিয়ে পদে পদে বাধার মুখে পড়ছেন দাসপাড়ার শতাধিক জেলে।


‘সুখ এনজিও থেইক্যা এক লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ আনছি। সেই টাকা দিছি নদী যারা ডাইক্যা আনছে তাদের। টাকা দিলে নদীতে মাছ ধরার অনুমতি মিলব- সেই আশায়। কিন্তু এখন তো টাকা দিয়াও মাছ ধরতাম পারতাছি না।’ কথাগুলো ২১ বছরের তরুণ রামপ্রসাদ দাসের। বংশপরম্পরায় তিনি জেলে।


সম্প্রতি ঘুরে জেলে পরিবারগুলোর দুর্ভোগের কথা জানা যায়। রামপ্রসাদ বলছিলেন, মাছ ধরতে নতুন জাল-নৌকা প্রয়োজন। কিন্তু আগের কিস্তি শোধ করতে না পারায় নতুন ঋণও পাচ্ছেন না। তাই নদীতেও নামতে পারছেন না। তাঁর কথায়, ‘মাছ না ধরতে পারলে এনজিওর ঋণ শোধ করুম কেমনে– আর পরিবার নিয়াই চলমু কেমনে! বুড়া মা-বাপ লইয়া এখন মরণ ছাড়া আর উপায় নাই।’ সারা দেশে নদী উন্মুক্ত থাকলেও তাদের এখানে নদীতে গেলেই চাঁদা দিতে হয়। এ বিপদ থেকে তাঁর মতো জেলেদের মুক্তি দিবে কে? এমন প্রশ্নও ছুড়ে দেন।

প্রায় শতাধিক জেলের পরিবার এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন, নদীতে মাছ ধরার অনুমতি পেতে। তাদের সবাই এখন বিপাকে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বাক-লঙ্গন আটউরি (বদ্ধ) জলমহালটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বাংলা ১৪৩১-১৪৩৬ সন পর্যন্ত ছয় বছরের জন্য নাসিরনগর ইউনিয়ন ও ভিটাডুবী ধীবর সমবায় সমিতিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। সমিতির সভাপতি পরিমল দাশের সঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) এ চুক্তি হয়। এতে ৩৩টি শর্ত উল্লেখ মেনে চলতে সমিতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সমিতির লোকজন চুক্তির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো লঙ্গন ও ধলেশ্বরী নদী দখল করে জেলেদের কাছে সাব-লিজ দিচ্ছেন। এতে জেলে পরিবারগুলো মাছ শিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মাছ ধরতে না পেরে অনেকেই ছেড়েছেন এলাকা। অনেকে বদলেছেন বাপ-দাদার পেশা। নদী দখলের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন স্বীকার করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও নিচ্ছে না।

এক মাস ধরে লঙ্গন ও ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী ভলাকুট ও গোয়ালনগর ইউনিয়নের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা গেছে, নদীর প্রায় ৩০০ একর প্রবহমান জলাশয় নিষিদ্ধ ঘোষিত বরজাল, খরাজাল, চায়না জাল, কারেন্ট জাল, সুঁতিজাল ও বাঁশের ঘেরে ঠাসা। এতে নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জেলেদের সঙ্গে নৌযান চালকদের প্রায়ই তর্কাতর্কি হয়। সম্প্রতি হাওরপাড়ের তিন ইউনিয়নের জন্য চালু করা নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটিও রোগী নিয়ে উপজেলা সদরে আসতে পারে না। অবাধে এসব এলাকায় মা মাছ ও ডিমওয়ালা মাছ শিকার হচ্ছে।

এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ১৭ বছর আগে চাঁদার বিনিময়ে নদীতে মাছ শিকারের নিয়ম চালু হয়। সেই প্রথা চালু রেখেছেন ভিটাডুবী সমবায় সমিতির সভাপতি পরিমল চন্দ্র দাস। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য বিএম ফরহাদ হোসেন সংগ্রামের আস্থাভাজন। অবৈধ চাঁদা আদায়ের কারণে সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। স্থানীয় জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন মাছ শিকার থেকে।

ওই সমবায় সমিতির কাছ থেকে জলমহালটি সাব-লিজ নেওয়ার দাবি করেন ভলাকুট কান্দিপাড়া সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক নান্টু দাস। তিনি বলেন, ‘এটি নদী, ঠিক আছে। কিন্তু ২০ বছর ধইরা আমরা তাদের কাছ থেকে এইভাবে সাব-লিজ নিয়া মাছ দরতাছি। আমাদের ইউনিয়নের ৪০০ জেলে পরিবার এই নদীতে মাছ ধরে জীবন চালায়।’

ভলাকুটের গীতা রানী দাসের অভিযোগ, ‘নেতারা গাং (নদী) ডাইক্যা আনে আর আমরা তাদের কাছ থেকে টাকা দিয়া মাছ ধরার অনুমতি নেই।’ তাঁর স্বামী জেলে নিহার দাস এইচএসপি সমিতি থেকে লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। নদীতে ধরা মাছ বিক্রির পর ঋণ শোধের কথা। এই আয়েই সংসার খরচ, সন্তানের পড়ালেখার খরচ জোটে। কিন্তু মাছ ধরাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে দিনকে দিন।

বাবা-দাদারাও এই নদী থেকে মাছ ধরেই সংসার চালিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন কৃষ্ণ দাস ও হরি দাস নামের দুই জেলে। কিন্তু ১৫-২০ বছর ধরে টাকা ছাড়া নদীতে নামা যায় না। তাই ক্ষেত-খামারে কাজ শুরু করেছেন কৃষ্ণ। অনুমতির জন্য এনজিও থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ করেছেন হরি। কিন্তু কিস্তি শোধের পর সংসার চালাতেই কষ্ট হয় বলে জানান। এ দুই জেলের আকুতি নদী উন্মুক্ত করে দেওয়ার।

ভিটাডুবী সমবায় সমিতির সভাপতি পরিমল চন্দ্র দাস নদীর বিভিন্ন অংশ সাব-লিজ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। কিন্তু এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলোচনা করে ‘সমঝোতার’ প্রস্তাব দেন।

লঙ্গন ও ধলেশ্বরীর প্রায় ৩০০ একর প্রবহমান অংশ প্রভাবশালীদের দখলে বলে স্বীকার করেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফাহিমুল আরেফিন। তিনি বলেন, স্থানীয় জেলেরা মাছ শিকার করতে পারছেন না। দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। ঘের উচ্ছেদ ও অবৈধ দখল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কয়েকবার প্রভাবশালীদের কাছে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। পরে আর অভিযানে যাওয়া হয়নি।

নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনা নাছরিনের কাছেও এ বিষয়ে তথ্য এসেছে। তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জেসমিন সুলতানা বলেন, নাসিরনগরে কোনো প্রবহমান নদী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইজারা দেওয়া হয়নি। যেটি দেওয়া হয়েছে- সেটি বাক-লঙ্গন আটউরি (বদ্ধ) জলমহাল। বিল ইজারা নিয়ে যদি নদী দখলের অভিযোগ ওঠে, আর তা প্রমাণিত হয়- তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!