ব্রেকিং

x

শিশুর বিকাশ আছড়ে পড়েছে করোনার রুক্ষ মাটিতে

শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ | 441 বার

শিশুর বিকাশ আছড়ে পড়েছে করোনার রুক্ষ মাটিতে
বাংলাদেশে আটকেপড়া শিশু আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশের সময় বৃত্তে বসে আছে।

শিশুর বিকাশ আছড়ে পড়েছে করোনার রুক্ষ মাটিতে। হঠাৎই রুদ্ধ হয়ে গেছে শিশুর মস্তিস্ক। করোনা ভয়ে সবাই শিশুদের ঘরে আটকে রাখছে। হাতে তুলে দেয়া হয়েছে মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট। কিন্তু তাতেও কতক্ষণই বা মন বসে?


আমার ৯ বছর বয়সী শিশু সামির দেশে করোনা প্রার্দুভাবের পর থেকেই ঘর থেকে বের হতে বারণ করে হাতে তুলে দিয়েছি মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট যাতে ঘর থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ না করে। তারপরও জানালার ধারে বসে বাইরের দিকে চেয়ে থাকছে। মাঝে মধ্যে বাইরে মানুষ দেখলে শিশু মন জেগে উঠে তার। খেলাধুলা করতে রাস্তা ও উঠানে যেতে অস্থির হয়ে পড়ে কিন্তু করোনা নিষেধাজ্ঞার জন্য গত প্রায় তিনমাস ধরেই ঘরে আটকে আছে সামির।

কল্পনার জগত আর মোবাইল ফোন এখন তার শৈশব। সামিরের মত দেশের লাখ লাখ শিশু এখন গৃহবন্দি। হঠাৎ করে চেনা পৃথিবী অচেনা হয়ে গেছে তাদের কাছে। আমার মত অনেক অভিভাবক শিশুকে ঘরে রাখতে হাতে তুলে দিয়েছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট। মোবাইল ফোন মন ভুলিয়ে রাখছে কিন্তু মনের খোরাক যোগাতে পারছে না। যে শিশুটি কয়েক মাস আগে স্কুল গেল, শিল্পকলা একাডেমিতে আকা, আবৃত্তি, নৃত্য, সংগীত, অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিল-মুর্হুতেই সব কিছু দূরে সরিয়ে দিল অদৃশ্য প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস।


খেলাধুলার মত সবচেয়ে প্রিয় বিনোদনও থেমে গেল তাদের। খেলা শিশুদের বেশী আনন্দ দেয়। খেলা শুধু আনন্দই দেয় না, খেলার মাধ্যমে শিশুর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক দক্ষতার বিকাশ ঘটে। খেলাধুলা শিশুর বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা শেখায় এবং ভাগাভাগি করে নেওয়ার মনোভাব তৈরীতে সাহায্য করে। শিশুর কল্পনা জগত ও নতুন কিছু সৃষ্টির চেষ্টাও খেলাধুলার মাধ্যমেই আসে।

আরও পড়ুন: একজন মানবিক ইউএনও তাহমিনা আক্তার রেইনা

অদৃশ্য এই প্রাণঘাতি ভাইরাসের ভয়ে আর কতদিন শিশুরা গৃহবন্দি থাকবে ? জানালায় বসে ফাকা উঠান দেখতে আর কতক্ষণ ভালো লাগে? মোবাইল টিপতেও ভালো লাগছে না আমার ছেলে সামিরের। করোনা পরিস্থিতি বুঝতে চাইছে না। ভবিষ্যৎ ভয়াবহতা সম্পর্কেও সে নির্বিকার। অসুখ যতই কঠিন হোক না কেন, সারাদিন ঘরে বসে থাকতে চাইছে না। প্রত্যেকদিন বিকালে বাড়ির উঠানে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যেতে, বন্ধুদের সাথে দলবেধে দৌড়াদৌড়ি করতো, ক্রিকেট, ফুটবলসহ অনেক ধরণের খেলাধুলা করতো। তার মত সমবয়সী বন্ধুরাও করোনায় ঘরে আটকা পড়েছে। সামিরের মত দেশের লাখো শিশু এই অদৃশ্য ভাইরাসের কারণে ঘরে আটকে আছে। আজকের এই পরিস্থিতিতে রুদ্ধ হয়ে গেছে শিশুর শৈশব বিকাশ।

করোনায় সমস্যা  শুধু শিশুর নয়। কিশোর-কিশোরীরাও পড়েছে মহা সমস্যায়। তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশ হলেও করোনায় প্রকাশের মঞ্চ খোজে পাচ্ছে না।

আমার বন্ধু ভারত ত্রিপুরার রাজধানীর আগরতলার দেবাতোষ চক্রবর্তীর মেয়ে শতভিষা চক্রবর্তী বেড়াতে বড্ড ভালবাসে। এবছর মাধ্যমিক পরীক্ষার পরই তার রাজস্থান আর দিল্লী বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। সেই আশা বুকে নিয়েই পড়াশুনায় বেশ মনোযোগী ছিল।  ভালয় ভালয় পরীক্ষা শেষ হল, কিন্তু বেড়াতে যাওয়াটা আর হয়ে উঠল না। কল্পনাতেই রয়ে গেল দিল্লী আর রাজস্থানের সুন্দর স্থানগুলো। মাধ্যমিকের জন্য নাচ করাটা বন্ধ ছিল আবার সেটা শুরু করবে। নাচ করাও হল না। সবচেয়ে পছন্দের যে কাজ, গল্পের বই পড়া – তাও পারছে না। সমস্ত লাইব্রেরি বন্ধ।

অদৃশ্য এই ভাইরাসে সারাবিশ্ব থেমে গেছে। থেমে গেছে সবকিছু। থেমে গেছে জনজীবন কিন্তু মানুষ তো আর জড় বস্তু নয়, বিশেষ করে শিশুর মন সবসময় অজানাকে জানতে, অদেখাকে দেখতে, অচেনাকে চিনতে চায়। কখন যে করোনা ভাইরাস থেকে শিশুরা মুক্তি পাবে তাও বুঝা যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন: আখাউড়ায় বিদ্যুতের ‘সামাজিক দূরত্ব’!

বাংলাদেশ ভ্রমন করতে এসে আটকেপড়া ১০৯ জন মানুষ গত বৃহস্প্রতিবার নিজদেশ ভারতে গেল। এর মধ্যে শিশু কিশোরও ছিল। ভারতে প্রবেশের আগে অন্তত দুই ঘন্টা শিশুরা একটি বৃত্তে দাড়িয়ে ছিল। দীর্ঘ সময় দাড়াতে কষ্ট হওয়ায় একটি শিশু বৃত্তের মধ্যে বসে যায়। তখন মনে হয়েছিল শিশুটি হয়তো অন্য কোন গ্রহ থেকে এসেছে তাই তাকে এভাবে রাখা হয়েছে। শিশুর এই দৃশ্য হৃদয় বিদারক ছিল। তাই আজকের লেখাটি এই ছবিটা দিয়েই শুরু হল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে একমাত্র অভিভাবকরাই পারেন শিশুর বিকাশে সহায়তা করতে। সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে করোনা আইন মেনে সামান্য সময়ের জন্য হলেও শিশুদের ঘর থেকে বের করতে পারেন। আজ থেকে আমার ছেলে সামিরকে নিয়ে সামান্য সময়ের জন্য হলেও ঘর থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটাই শিশুদের একমাত্র মুক্তির পথ বলে আমি মনে করি।

লেখক
নুরুন্নবী ভুইয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি
এশিয়ান টেলিভিশন

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!