ব্রেকিং

x

মোকামের সন্ধানে : পাঠ প্রতিক্রিয়া সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – রাখী বিশ্বাস

সোমবার, ২৮ জুন ২০২১ | ১০:৩৭ অপরাহ্ণ | 1235 বার

মোকামের সন্ধানে : পাঠ প্রতিক্রিয়া সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম – রাখী বিশ্বাস
রাখী বিশ্বাস

মোকামের সন্ধানে : পাঠ প্রতিক্রিয়া সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম
অবশেষে পড়া হয়ে গেলো। দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, নানা গল্প, কাহিনী, উপন্যাস পড়তে পড়তে দেশটার জন্যে মনের মধ্যে একটা অন্যরকম অনুভূতি তৈরী হয়েছে, শেকড়ের টান তো আছেই, সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। প্রতিবছর একবার করে প্ল্যান করি ঘুরতে যাওয়ার, কিন্তু নানা ঝঞ্ঝাটে আর যাওয়া হয়ে উঠে না, নাকি কাহিনী শুনে শুনে, পড়ে পড়ে যে স্বপ্নের মোহজাল তৈরী হয়েছে, সেই মোহ ভেঙ্গে যাওয়ার ভয়, সঠিক বলতে পারবো না।
বইটা যখন পড়তে শুরু করি, তখন ও বুঝতে পারিনি কথকতার কোন অথৈ সাগরে ডুবতে চলেছি। ভাষা নিয়ে একটু হোঁচট ও খাই, যেহেতু স্বাচ্ছন্দে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন লেখক। তবুও তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। একসময় লেখক, মোকছেদ, ফকিরসাব আর ফকির বিবি’র সঙ্গে সঙ্গে ‘ কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপর থেকে নীচে হোটেলঘরে আসি’। ফকির আর ফকির বিবি’র দেহতত্ত্ব গানের সুরে হারিয়ে ফেলি নিজেকে। আবার  যখন খুঁজে পাই তখন সামনে কালীগঙ্গা। লেখকের সঙ্গে মনে মনে বলি, “এই প্রদোষ সময়ে, যখন সমগ্র চরাচর সুপ্ত, কোনো কোলাহল নেই, কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, তখন যেন অনুভবই তীব্র হয়ে ওঠে। মন বিচার করতে চায় না, বিশ্বাস করতে চায়।সে বিশ্বাস কীসের উপর বিশ্বাস জানি না, তবে তা যুক্তি বা ন্যায়সূত্রের জটিলতায় না গিয়ে সাধারণের, সহজ বিশ্বাসের সরল পথ ধরেই যেন বেশি সাবলীল। তখন এই ফকিরদেরই মতো বলতে সাধ হয় – মানুষরতন, কর তারে যতন – যাহা তোমার প্রাণে চায়।”
তারপর লেখকের সঙ্গে ট্রলারে করে পায়ে পায়ে চলে আসি ঘাটে, ওপার কীর্তিপাশা, এপারে নাম রুনসী। একের পর এক দৃশ্যপট বদলাতে থাকে।  চোখের সামনে দেখতে পাই সৈয়দ আলী চাচা, নসু, ভাবী, নিবারণ কাকা, মুঈনুদ্দিন চাচা, চাচি এদের সবাইকে আর ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করি। কখনো খালের ধারের রেইনট্রি’র  নীচে বসে পড়ি। খলিল  ঠাহুর এর ভোগ রান্না, জামাই মেম্বারকে নিয়ে রগড় চোখের সামনেই ঘটে যেন। ছোমেদ এর জারি, কার্তিকের কথকতায় হারিয়ে যাই সেই না দেখা পূজামণ্ডপে, দৌলত – সরস্বতীর কাহিনীতে, গঞ্জের মানুষের সুখে, দুঃখে মুহূর্তে সামিল হয়ে যাই যেন, একাত্ম হয়ে যাই তাদের জীবনের সঙ্গে, জীবন যুদ্ধের সঙ্গে।
কথকতার আসর শেষে, লেখক এভাবে শেষ করছেন, “এ আসর এখানে শেষ তো আবার নতুন কথকতায় কোথাও বসে হয়তো। এই প্রাকৃত জীবনের বহুতার মতোই তার বহতা। অনেক দূরের শরীর মানসপথ পাড়ি দিয়ে আমি এক নীল কুয়াশার প্রান্তরে এসে পড়েছি। এই আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম। এ প্রান্তর আমার চেনা, অথচ চেনা নয় যেন। মনে হচ্ছে
অনন্ত জীবন যদি পাই আমি
পৃথিবীর পথে যদি ফিরি আমি
দেখিব সবুজ ঘাস
ফুটে ওঠে – দেখিব হলুদ ঘাস ঝরে যায়
– দেখিব আকাশ
শাদা হয়ে উঠে ভোরে।
যেমন এখন, এই মুহূর্তে দেখছি রাতভর এই পরণকতায় যেমন দেখেছি।
এই স্থির নীরবতা এই করুণতা
বহুক্ষণ আমারে থাকিতে বলে এইখানে।
এ কারণেই কি আমার বারবার এই উৎসে ফেরার চেষ্টা? আমার এই জীবনও এই কথকতার অংশীদার হবে, এই সাদা ভোরের নীল কুয়াশার বিগত অনন্ত উজাগর রাত্রির পরণকথা সুর আর রঙে আমাকে ঘিরে থাকবে, এই জীবন আর প্রাকৃত চর্যাপদের ছন্দে আমাকে শিকড়ে পৌঁছে দেবে –
এর চেয়ে বেশি রূপ বেশি রেখা বেশি করুণতা
আর কে দেখাতে পারে
আকাশের নীল বুকে অথবা এ ধুলার আঁধারে…..”
সেই গঞ্জ, তার মানুষগুলোর কাছে একবার চলে যেতে খুব মন চাইছে। জানতে ইচ্ছে করছে কেমন আছে মোকছেদ, ফকিরসাবের হোটেল আজও আছে কিনা, ফকিরবিবি এমনি দেহতত্ত্বের গান ধরেন কিনা। পূজামণ্ডপ এখনো আগের মতো জমজমাট হয়? খলিল ঠাহুর এখনও ভোগ রান্না করেন? জামাই মেম্বার এখনও কি মসজিদের টিন নিয়ে আসেন পূজামণ্ডপের জন্যে। সর্বোপরি ছোমেদ কি জারি কথকতার আসর বসায়? কার্তিক কি এখনও সানাই নিয়ে বসে পড়েন??
ভালো থাকুক গঞ্জ আর গঞ্জের মানুষগুলো।


লেখক-রাখী বিশ্বাস, আগরতলা


আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!