ব্রেকিং

x

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করোনায় ২০ সংঘর্ষে শিশুসহ ৫ নিহত, কয়েকশ আহত

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২০ | ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ | 2157 বার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করোনায় ২০ সংঘর্ষে শিশুসহ ৫ নিহত, কয়েকশ আহত

করোনা পরিস্থিতিতে গত এক মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যে সংঘর্ষটি বেশি অলোচিত ছিলো নবীনগর উপজেলায় পা কেটে হাতে নিয়ে শ্লোগান দেয়ার ঘটনা। ১২ এপ্রিল উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের থানাকান্দি গ্রামে পূর্ববিরোধকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষে পা কেটে নেয়া ব্যক্তি মোবারক মিয়া মারা যান। অথচ সংঘর্ষের কিছুদিন আগেও স্থানীয় সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের বিরোধের মীমাংসা হয়।


সংঘর্ষকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় ভাষায় ‘কাইজ্জা’ বলে। করোনায় সরকারি ছুটি ঘোষণার পর ২৬ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অন্তত ২০টিরও বেশি ‘কাইজ্জা’র ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে দুই মাসের শিশুসহ পাঁচজন। আহত হয়েছে কয়েকশ’। বাড়িঘর লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। লাঠিপেটার পাশাপাশি টিয়ার সেল, রাবার বুলেট ছুড়ে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আহত হয়েছেন পুলিশ। এসব ঘটনায় মামলা হলে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদকসহ অর্ধশতাধিক গ্রেপ্তার হয়েছে।


সর্বশেষ বুধবার সকালে সরাইলের কাটানিশার গ্রামে মসজিদে যাওয়া নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অর্ধশত লোক আহত হন। এর দুই দিন আগে ২৭ এপ্রিল নাসিরনগরের গোকর্ণ গ্রামে বাড়ির রাস্তা নিয়ে হামলায় দুই মাস ১০ দিন বয়সি শিশু ফারিয়া নিহত হয়। জেলা সদরসহ প্রত্যেক উপজেলাতেই পান থেকে চুন খসলেই যেন ঘটেছে এসব সংঘর্ষ। ধানের উপর দিয়ে ট্রাক্টর যাওয়া, এক বাড়ির হাঁস আরেক বাড়িতে যাওয়া, কথা কাটাকাটি, বাড়ির সীমানা ও রাস্তা নিয়ে বিরোধসহ ছোটখাট কারণে এসব সংঘর্ষ হয়।

এমনিতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাধিক উপজেলা সংঘর্ষ প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনায় সারাদেশেই আলোচনা হচ্ছে। বলা চলে, কাইজ্জার কাননে (বাগান) করোনাও যেন কাতর হয়ে পড়েছে।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনের এলাকা, বহু গুণী মানুষের জন্মের স্থান, ‘সংস্কৃতির রাজধানী’র খ্যাতি ইত্যাদিকে ছাপিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংঘর্ষ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বেশ ট্রল হচ্ছে। ট্রল এতটাই বেশি হচ্ছে যে একাধিক আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

করোনা পরিস্থিতিতে ১১ এপ্রিল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে লকডাউন করা হয়েছে। লকডাউনের মধ্যেই বরেণ্য ইসলামী আলোচক যোবায়ের আহম্মদ আনসারীর জানাজায় লাকো মানুষের উপস্থিতিও সারাদেশে আলোচনার জন্ম দেয়।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সূত্র মতে জেলায়, গতকাল বুধবার পর্যন্ত জেলার ৩৯ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীও রয়েছেন। মারা গেছেন দুই জন। আইসোলেশনে থাকাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন সাতজন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুধীজন সংঘর্ষের ঘটনার নেপথ্যে এলাকা ও বংশগত প্রভাব বিস্তারকে প্রধান সমস্যা হিসেবে দায়ি করেছেন। এছাড়া জনপ্রতিনিধিদের ইন্দনও এর পিছনে কলকাঠি নাড়ে বলে অভিযোগ অনেকের। এ অবস্থা থেকে পরিত্রান পেতে এলাকার মানুষের বিবেক জাগ্রত হওয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন সুধীজনেরা। পাশাপাশি সংঘর্ষ প্রবণ এলাকায় আইনশৃংখলা বাহিনীর অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর উপর জোর দেয়ার দাবি তুলেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নাগরিক ফোরামের সাধারন সম্পাদক রতন কান্তি দত্ত বলেন, ‘আমাদের এখানে সংঘর্ষে যারা জড়ায় তারা নিজেরাই বলতে পারেন না কি কারণে তাঁরা এসব করছেন। লকডাউনের মধ্যেও সংঘর্ষে জড়নোর বিষয়টি থেকেই বুঝা যায় এখানকার মানুষকে এ অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে জনসচেনতার কোনো বিকল্প নেই। সংঘর্ষ লাগিয়ে রেখে স্থানীয় যেসব সর্দার-মাতাব্বর কিংবা জনপ্রতিনিধিরা যে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে সেটা মানুষকে বুঝাতে হবে। আইনশৃংখলা বাহিনীকে আরো কঠোর হয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বৈশ্বিক এ পরিস্থিতিতে সংঘর্ষ যারা জড়াচ্ছেন তাদেরকে ‘অসুর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আল-মামুন সরকার। ক্ষুব্দ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এলাকার মানুষের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন না ঘটাতে পারলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব না। একের পর এক এসব সংঘর্ষের ঘটনা খুবই পীড়াদায়ক।’
পাঁচ খুন

হামলার সর্বশেষ বলি ফারিয়া নামে দুই মাস ১০দিন বয়সি এক শিশু। গত ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের গোকর্ণ গ্রামে হত্যাকান্ডের শিকার হয় বরিশালের বাকেরগঞ্জের শ্যামপুর গ্রামের রাজু মিয়ার মেয়ে ফারিয়া। প্রবাসী রাজু মিয়ার স্ত্রী নাইমা বাবার বাড়ি নাসিরনগরেই থাকতেন। শিশু ফারিয়ার আত্মীয় কাবির মিয়ার স্ত্রী জোসনা বেগমের সঙ্গে রাস্তা নিয়ে প্রতিবেশি জসিম মিয়ার কাটাকাটির জেরে এ হামলা হয়।

নবীনগরের কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান ও এলাকার সর্দার আবু কাউছার মোল্লার মধ্যে বিরোধের জের ধরে ১২ এপ্রিল থানাকান্দি গ্রামে সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। এ সংঘর্ষ চলাকালে মোবারক মিয়া নামে এক ব্যক্তির পা কেটে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেয়া হয়। পরে মোবারক মিয়া মারা যান। এ ঘটনায় জিল্লুর রহমান ও কাউছার মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৩ এপ্রিল নাসিরনগরে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন নাসিরনগরে উপজেলার কদমতলী গ্রামের সোলেমান মিয়ার ছেলে ও গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার মোস্তফা কামাল ওরফে মস্তু মিয়া (৬০)। ওই দিন সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে গ্রামের পশ্চিমদিকে গিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার সময় অতর্কিত হামলার শিকার হন মোস্তফা কামাল।
৪ এপ্রিল সকালে কসবায় খুন হন উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের মো. সলিমুল্লাহ’র ছেলে মো. তানভীর (২২)। পূর্ববিরোধ ও মাটি কাটা নিয়ে ঝগড়ার জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় তানভীর খুন হন বলে পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেছেন।
জেলার আশুগঞ্জ উপজেলা সদরের মুন্সী মার্কেটের সামনে ২৭ মার্চ প্রতিপক্ষের হামলায় মো. জাহাঙ্গীর আলম (৫১) নিহত হয়েছেন। নিহত জাহাঙ্গীর উপজেলার চরচারতলা গ্রামের মো. ইলু মিয়ার ছেলে। মুন্সী মার্কেটের পাশে একটি পোড়া গুদামে জুয়ার আসরে তিনি হামলার শিকার হন।
যত সংঘর্ষ

জেলার সবচেয়ে দাঙ্গাপ্রবণ এলাকা সরাইলে গত ৫ এপ্রিল একদিনেই উপজেলার টিঘর, বড়ইছড়া, বিটঘর, নোয়াগাঁও, ধরন্তী, সৈয়দটুলা (দুইটি ঘটনা) এলাকায় সাতটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বড়ইছড়ায় অর্ধশতাধিকসহ শতাধিক লোক আহত হন। ওই দিন বিকেলে মার্বেল খেলা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৌর এলাকার দক্ষিণ পাড়ায় দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন। সংঘর্ষে মোজাহিদ নামে এক যুবকের ডান চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।

গত ৩১ মার্চ সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের ভুঁইশ্বর গ্রামে গতকাল মঙ্গলবার হওয়া দু’দল গ্রামবাসীর সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক লোক আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে ২৬ রাউন্ড রাবার বুলেট ও ১০ রাউন্ড টিয়ার সেল ছুড়তে হয়। ২৬ মার্চ বিজয়নগরের সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সংঘর্ষে ২০ জন আহত হন। একই উপজেলার আদমপুরে ২৬ এপ্রিল পাওনা টাকার জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। গত ১১ এপ্রিল বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সোনারামপুর ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামে পূর্ব বিরোধের জের ধরে হওয়া সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। একই দিন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে খাজানগর এলাকার কবরস্থানে দাফন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশ। পরদিন সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের আঁখিতারা গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩০ জন আহত হন।
তবুও আশা

সরাইলের এক পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ অফিসারও বিব্রত থাকেন। পুলিশ দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করে দিয়ে অস্ত্র জমা নিয়ে চেষ্টা করেছে পরিস্থিতি থেকে পরিত্রান পাওয়ার। কিন্তু এতেও তেমন একটা লাভ হয় নি। তিনি সংঘর্ষকারিদের উপর সৃষ্টিকর্তার রহমত আশা করেন।

নবীনগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘রাজনীতি কিংবা দলাদলি নয় মূলত এলাকাভিত্তিক বংশগত আধিপাত্যের কারণেই সংঘর্ষের ঘটনাগুলো ঘটছে। এবাদুল করিম বুলবুল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৫-২০টি এলাকাকে চিহ্নিত করে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করি। কিছু উদ্যোগ নিয়ে সমাধানও করি। এরপরও সংঘর্ষ হয়। আসলে মানুষের বিবেক জাগ্রত হতে হবে। নইলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রান সম্ভব নয়।’

খেলাঘর আসর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের চেয়ারম্যান ডা. মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘মানুষকে সচেতন করা ছাড়া এ অবস্থা থেকে পরিত্রানের বিকল্প নেই। এজন্য সমাজের সকল স্তরের নেতৃবৃন্দকে একযোগে কাজ করতে হবে। এসব ঘটনার নেপথ্যে যারাই থাকুক না কেন তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে আইনশৃংখলা বাহিনীকে।’

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!