ব্রেকিং

x

করোনাকালে ক্রিটিকাল কেয়ারঃ তিন

প্রানহানী আর লকডাউনের অভিজ্ঞতা

রবিবার, ০২ মে ২০২১ | ৭:০৮ অপরাহ্ণ | 909 বার

প্রানহানী আর লকডাউনের অভিজ্ঞতা
ডাঃ নিবেদিতা নার্গিস

গতবছর মার্চ মাসের ১৮ তারিখ বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের প্রথম মৃত্যুর ঘোষনা আসে। ইতালি থেকে ফিরে আসা এক নাগরিকের পিতার মৃত্যুসংবাদ শুনে দিশাহারা হই। স্টেজ টু সংক্রমণ। যার পিতার মৃত্যু হলো ব্যাপারটা সেই ব্যক্তিকে কতোটা বিচলিত করেছিলো সেটা জানবার কোন উপায় নেই। তবে তিনি এতে অবশ্যই তার দায় এড়াতে পারেন না।


এদিকে আমার ছেলে গল্পর নতুন করে আবার জ্বর আসে। আমি ক্লোরোকুউন ট্যাবলেট কিনে নিয়ে এসেছি। অধিক সতর্কতায় আমি গল্পকে তা খাওয়ানো শুরু করি। কিন্তু সে করোনা পজিটিভ কিনা এটা পরীক্ষা করার জন্য আমি উদগ্রীব হইনি। ঘর থেকে বের হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া মানে নেভেটিভ থাকলেও পজিটিভ হয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা। যুক্তিসংগত কারণেই আমি এড়িয়ে গেছি পরীক্ষা নিরিক্ষা করার ধকল।


মার্চ মাসের বিশ তারিখ মিরপুর এলাকায় প্রথম কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের রোগী পাওয়া যায়। এই রোগী রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে ডেল্টাতে এসে আই সি ইউতে মৃত্যুবরন করে। তার মৃত্যুর পরদিনই তার এক প্রতিবেশীও মারা যান। এই দুজনেই একই সময়ে মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তে যেতেন। সেখানেই অজ্ঞাতসারে কোন বিদেশফেরত করোনা পজিটিভ ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন বলেই ধারণা করি। আগের দিনই টোলারবাগ এলাকায় একটি বাড়ি লক ডাউন করা হয়েছিলো। এখন একসাথে চল্লিশটি বাড়ি লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ঘুম ছাড়া বাকি সবটুকু সময় আমি অনলাইনে আমার মেয়ে কাব্যের সংস্পর্শে আছি। লকডাউনের এই সময়টায় অনলাইনে তার ক্লাস, অ্যাসাইমেন্ট, ছোট ছোট পরীক্ষা সবই চলছে। কাব্য আজকাল দিনে বেশি ঘুমাচ্ছে আর রাতে জেগে থাকছে। আমাদের সময়ের ঠিক উল্টাপিঠে তার অবস্থান। ঘড়ির কাঁটা একেবারে একই সময় নির্দেশ করে সেখানে। শুধু এম আর পি এম এ পার্থক্য।

এসময়ে আমি কন্টাজিয়ন আর প্যানডেমিক মুভি সম্পর্কে অবগত হই। এই মুভিগুলি সবাই দেখছে বলে আমিও লিংক দিতে বলি। এটি ইউ টিউবে পাওয়া যাচ্ছিলো না বলে পরে মেসেঞ্জার অন রেখে কন্টাজিয়ন ছবিটি নেটফ্লিক্স এ একসাথে দেখি মা আর মেয়ে।

২২ মার্চ টিভি দেখে প্রথম ডাক্তার আক্রান্ত হবার খবর শুনি। কদিন ধরেই আব্দুন নুর তুষার পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট নিয়ে একা সোচ্চার হয়ে কথা বলছিলো। ডাক্তার আক্রান্তের খবর শুনে খুব উদ্বিগ্ন হই। ডেল্টা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আই সি ইউ ডাক্তার কোভিড পজিটিভ!অনেকজন ডাক্তার ইতিমধ্যে বাধ্য হয়ে কোয়ারান্টাইনে গেছে। এদিনই সিদ্ধান্ত হয় রুটিন রোগীর চিকিতসা আপাতত বন্ধ রাখা হবে। সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে আমরা সবাই স্বস্তি অনুভব করি। মার্চের শেষ সপ্তাহে এসে দেশে সামরিক বাহিনী নামানো হয়।
মার্চের তেইশ তারিখে সাধারণ ছুটির ঘোষনা দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনায় কেন লক ডাউন না বলে সাধারণ ছুটি বলা হলো এ নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু ব্যাখা রয়েছে। সরকার এটি বিবেচনা করেই করেছে বলে মনে করি। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হলেও তা ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি। এক্ষেত্রে ছুটি ঘোষনার মাধমে বেশিরভাগ মানুষজন নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়েছে। ফলাফলস্বরূপ ঢাকা শহরে স্থায়ী জনগনেরাই কেবল থেকে গেছে। এতে ঢাকার জনসংখ্যা কমেছে। ফলস্রুতিতে কয়েকটি লাভ। প্রথমত অল্প মানুষ ঢাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য বের হলেও তা অনাকাংখিত ভিড় তৈরি করেনি। দ্বিতীয়ত ঢাকায় সম্ভাব্য আক্রান্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা কমেছে। তৃতীয়ত রাস্তাঘাটে যানবাহন কম বের হওয়ার কারণে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা সহজ হয়েছে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো মৃতদেহের সৎকার। যদি করোনার কারণে মৃতের সংখ্যা বাড়ে তবে তার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা জমি ঢাকা শহরে নাই। অতএব এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে বলেই মনে করি।

২৪ মার্চ হাসপাতালের ডিউটিতে এসেই জানতে পারি গত রাত্রে ভর্তি হওয়া করোনা আক্রান্ত সন্দেহের রোগীকে ডিসচার্জ দিয়ে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যারা হ্যান্ডেল করেছে তাদের কেউ কোয়ারান্টাইনে যায় নাই। তেমন সুরক্ষিতও ছিলো না কেউ। আমি তড়িৎগতিতে এডমিনিস্ট্রেশনকে জানিয়ে ব্যবস্থা নিয়ে তাদেরকে চৌদ্দ দিনের জন্য বাড়ি পাঠিয়ে দিই। দেশের প্রথম মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ডাক্তারদের হাতে নিজেকে সুরক্ষা দেবার কিছুই ছিলো না। কোথাও পি পি ই দেয়া হয় নাই। রোগ শনাক্ত করার জন্য ল্যাবও প্রস্তুত নয়। শুধু আই ই ডি সি আরেই টেস্ট হচ্ছিলো। ডাক্তারদের তরফ থেকে আগাম সতর্কতা দেয়া হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তা আমলে নেয়নি। একইভাবে পেরিফেরিতেও এখনো অপ্রতুল স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রোটেকশন। সাধারণ মানুষের সাথে সাথে আক্রান্ত হচ্ছে চিকিৎসাসেবায় জড়িত নিরপরাধ কিছু মানুষ। আবার দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা না পাবার অপবাদেও তাদেরকেই অভিযুক্ত করা হচ্ছে। রাত্রে আমার ছোটভাইটিকে বাসায় ডেকে আনি। তাকে উপদেশ দিই মসজিদে যেয়ে নামাজ না পড়ার জন্য। আমার ড্রাইভার বলছিলো তার জ্বর সর্দি। সেও গ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। তাকেও যেতে দিতে সম্মত হই সংগত কারণে । গাড়ির চাবি সে কাগজে মুড়ে বাসায় পাঠানোর পরে আমি তা সাবান পানি দিয়ে পরিষ্কার করি। বেতনটা খামবন্দী করে পাঠিয়ে দিই দারোয়ানের মাধ্যমে। এরপর সবসময় সেলফোনে যোগাযোগ রেখেছি। সে সেরে উঠেছে, আলহামদুলিল্লাহ।

পঁচিশে মার্চ ছিল নারী ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শেষদিনের ডিউটি। হাসপাতালের ডিউটি বিহীন দিনগুলিতে আমি সাধারণত ব্যস্ত থাকি দেশে বিদেশে ঘোরাঘুরির মধ্যে। এবারই তার ব্যতিক্রম। আমি বাসায় বন্দী ছিলাম। আর দশটা গৃহিনীর মতই সারাদিন কেটে যাচ্ছিলো সাংসারিক টুকিটাকি ব্যস্ততায়।

-লেখক-ডাঃ নিবেদিতা নার্গিস
এফ.সি.পি.এস,এম.ডি
সহযোগী অধ্যাপক এবং হেড অফ ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট
জাপান ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
আইচি নগর, উত্তরা, ঢাকা।

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!