ব্রেকিং

x

গ্রামে শ্মশাণ থাকলেও সৎকার করতে গেলে লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে আসে প্রভাবশালী গোষ্ঠী

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২০ | ১০:৪২ অপরাহ্ণ | 1979 বার

গ্রামে শ্মশাণ থাকলেও সৎকার করতে গেলে লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে আসে প্রভাবশালী গোষ্ঠী

বিশ্বজিৎ পাল বাবু,
শহীদ পরিবারের সন্তানহীন নাডু গুপ্ত ও জনু রানী গুপ্ত দম্পত্তি গ্রামের ছেলে মেয়েদের কথা চিন্তা করে বিশাল মাঠ দান করে গেছেন। ওই মাঠটি গ্রামটির জন্য বড় পাওনা। অথচ ওই গ্রামেই সৎকার করা সম্ভব হয়নি মাস দেড়েক আগে প্রয়াত হওয়া জনু রানীর। মো. রহমত উল্লাহ নামে গ্রামের এক ব্যক্তি জানালেন, নৌকায় করে প্রায় ছয়-সাত কিলোমিটার দূরের আরেক গ্রামে নিয়ে জনু রানীকে দাহ করতে হয়। নিজ গ্রামে শ্মশাণ থাকলেও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বাধার মুখে সেখানে কাউকে সৎকার করা যায় না।


গ্রামটির নাম রুটি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নে অবস্থিত। ওই গ্রামে শুক্রবার সরেজমিনে গেলে সেখানকার লোকজন ওই প্রভাবাশালী গোষ্ঠীর অন্যায় অত্যাচারের কথা তুলে ধরে জানান, সৎকার করতে গেলেই লাঠিসোটা নিয়ে এসে হুমকি দেয়া হয়। বছর চারেক ধরে এ নিয়ে অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেছে।


সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই শ্মশাণের ভূমি নিয়ে প্রভাবশালী সরকার গোষ্ঠীর সঙ্গে এক মামলায় ২০১৬ সালে রায় আসে শ্মশাণের পক্ষে। এরপর থেকেই মূলত ওই গোষ্ঠীর লোকজন শ্মশানটিতে সৎকার করতে বাধা দিয়ে আসছেন। অবশ্য গ্রামবাসীর চাপের মুখে শ্মশাণের পাশে সড়কের ধারে কয়েকজনকে সৎকার (সমাধিস্থ) করতে দেয়া হয়।
জেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের গ্রাম রুটি। এক সময় পুরোপুরি হিন্দু অধ্যুষিত ওই গ্রামটিতে এখন ২০ পরিবারের মতো বসবাস। এর মধ্যে বেশিরভাগই দেবনাথ সম্প্রদায়ের, যাদের রীতি অনুযায়ি মাটি দেয়া হয়। বাকি গুপ্ত, শীল ইত্যাদি পরিবারের লোকজনকে দাহ করা হয়।

রুটি বাজারে প্রবেশের আগে সেতু পার হয়ে বাম দিকে কয়েকশ’ গজ যেতেই চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির বটগাছ। অনেকের মতে, এই বটগাছটিই শ্মশানের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। সেখানে জড়ো হওয়া মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দেখিয়ে দিলেন বটগাছের চারপাশ ঘিরে ৮২ শতাংশ জমি শ্মশাণের। কিন্তু প্রয়াত আমীর হোসেন সরকারের পরিবার ও গোষ্ঠীর লোকজন এখানে সৎকার করতে দেন না। জায়গাটিতে এখন পানি উঠে আছে। একপাশে ছোট্ট একটি ঘর করে রাখা হয়েছে। সরকার পরিবারের লোকজন বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, জায়গাটি নিয়ে ২০০২ সাল থেকে মামলা চলমান। আমীর হোসেন সরকার মালিকানা দাবি করে ও মনি দেবনাথ জায়গাটি সরকারি দাবি করে মামলা লড়েন। ২০১৬ সালের ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতের এক রায় শ্মশাণের পক্ষে আসে। এরপর আমীর হোসেনের পক্ষে আপীল করা হলেও হেরে যান। বর্তমানে আমীর হোসেন ও মনি দেবনাথ দু’জনই প্রয়াত। আমীর হোসেনের মালিকানা দাবির সূত্র ধরে এখন তাঁর ছেলে ও স্বজনরা সৎকারে বাঁধা দেন।
২০০১ সালের সরকারি এক নথিতে দেখা যায়, রুটি গ্রামের ২৩২৫/৪৮২৮, ২৩২৪/৪৮৬৪, ১৩৩৩/৫৭৮৮ দাগে মোট ৮২ শতাংশ জায়গার মালিক বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক। ওই দাগের ৫৯ শতাংশ জায়গা সমাধির জন্য ব্যবহার্য্য ও ২৩ শতাংশ জায়গা শবদেহ ধৌত করার জন্য ব্যবহার্য্য বলে ওই নথিতে লেখা আছে।

গ্রাম পুলিশ দিলীপ দেবনাথ জানালেন, প্রায় আড়াই বছর আগে তাঁর মা মারা গেলে এখানে মাটি দিতে এসে বাধার সম্মুখীন হন। সরকারের পরিবারের লোকজনের দেখানো জায়গা মতে একটি ব্রিজের পাশে সরকারি জায়গার তাঁর মাকে মাটি দিতে হয়।
গ্রামের চন্দন দেবনাথ, শুকলাল দেবনাথসহ আরো কয়েকজন জানান, শ্মশাণে লাশ নিয়ে গেলেই সরকার গোষ্ঠীর লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে আসে। ভয়ভীতি দেখায়। বছর খানেক আগে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে এখানে যেন কারো লাশ আনা না হয়।

এসব কথায় বাদ সাধেন আমীর হোসেন সরকারের ছেলে ফরহাদ সরকার। বলেন, ‘সৎকার করতে আমরা কাউকে বাধা দেই না। জায়গাটি সব সময় পানিতে তলিয়ে থাকে বলে অনেক সময় আমরা নিজেদের জায়গাতেই সমাধির ব্যবস্থা করে দেই। এছাড়া ছেলে মেয়েরা ওই জায়গায় খেলাধুলা করে বলে সেখানে না দিয়ে অন্যত্র দিতে বলি।’

ছুটে এসে আমীর হোসেনের আরেক ছেলে ফরিদ মিয়া সরকার বলেন, ‘এটা আমার বাবার কেনা সম্পত্তি। তবে কার কাছ থেকে কিভাবে কিনেছে সেটা জানি না। ছোটবেলা থেকেই দেখছি বাবা মামলা-মোকাদ্দমা লড়ছে। এখন আমরা লড়ছি। সব কাগজপত্র কোর্টে জমা দেয়া আছে। যে কারণে আমরা কাগজপত্র সম্পর্কে কিছু বলতে পারবো না।’
রুটি বাজারে এসে কথা হলে ওই গ্রামের সারোয়ার আলম রাসেল নামে এক যুবক বলেন, ‘এখানকার হিন্দু সমাজের একমাত্র শ্মশাণ এটা। কিন্তু সরকার গোষ্ঠীর লোকজনের বাঁধার মুখে এখানে সৎকার করতে পারে না। আমরা শ্মশানটি দ্রুত উদ্ধার চাই।’

পাশের নুরপুর গ্রামের মো. শাহ আলম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা তো অনেক আগে থেকেই এটা চিতাশাল (শ্মশাণ) হিসেবে চিনি। ভয়ে সন্ধ্যার দিকে এর আশেপাশে থাকতাম না। এখন এটা দখল হতে চলেছে।’ এখানে সৎকারে বাধা দেয়া হয় বলে তিনি জেনেছেন বলে জানান।
ধরখার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি এটা শ্মশাণের জায়গা। কিন্তু এখন এটাতে সৎকার করতে বাঁধা দেয়া হয়। যে কারণে এখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন খুব সমস্যায় আছেন। শ্মশাণটি উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছি।’
আখাউড়া পৌরসভার ও উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক মো. তাকজিল খলিফা কাজল বলেন, ‘সেখানকার মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এসে আমাকে বিষয়টি জানিয়ে গেছে। আমি তাঁদেরকে বলেছি স্থানীয়ভাবে একটি কমিটি করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে। আমিও স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের পরামর্শ নিয়ে কিভাবে কি করা যায় সেটা করবো। কাউকে অন্যায়ভাবে সৎকারে বাধা দিতে ও শ্মশাণ দখলে রাখতে দেয়া হবে না।’

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!