ব্রেকিং

x

করোনাকালে ক্রিটিকাল কেয়ার (এক): একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু

শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল ২০২১ | ১২:৫৬ অপরাহ্ণ | 1419 বার

করোনাকালে ক্রিটিকাল কেয়ার (এক): একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু
লেখক-ডাঃ নিবেদিতা নার্গিস

২০১৯ সালের অগাস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহের কথা বলছি। তখন ডেংগুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুঝুঁকিতে দেশের বহু মানুষ। আমার মেয়ে কাব্যর গায়ে বেশ জ্বর এলো, সাথে গা ব্যথা। আমাকে জানাতেই জ্বর মাপলাম থার্মোমিটারে। একশো দুই। সংক্রমণ ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। ইতিমধ্যে কয়েকজন চিকিৎসকও মৃত্যুবরণ করেছেন। বেশ ভড়কে গেলাম।


ইউনিভার্সিটি বন্ধ ছিলো বলে সেই সময়ে ক্যানাডা থেকে দেশে এসেছে কাব্য। চারমাসের গ্রীষ্মের ছুটি প্রায় শেষ তখন। অগাস্টের শেষ সপ্তাহে দেশ থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য টিকিট কেটে রেখেছে আমার মেয়ে । এখন জ্বর বাঁধালে তো ফিরে যাওয়া মুশকিল হবে মেয়েটার।


ডেংগু হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হলো উত্তরাতেই। রেজাল্ট নেভেটিভ এলো দুদিনের জ্বরে। খুব ক্লান্তি নিয়ে ব্যাগ আর লাগেজ গোছালো কাব্য। নির্ধারিত দিনে রওনা হলো কানাডার উদ্দেশ্যে। সময়মতো তাকে যাত্রা করিয়ে দিতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমিসহ পরিবারের সকলেই।

আমার মেয়ে কাব্য পড়াশুনা করছে ক্যানাডার সাচকাচোয়ান প্রভিন্সের রাজধানী রেজাইনাতে। ২০১৮ সালে সে আন্ডারগ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে এনভায়রনমেন্টাল জিও সায়েন্সে ভর্তি হয়েছে। প্রথম বর্ষ সমাপনের পরে সে দেশে এসে ছুটি কাটায়। ২০১৯ সালের অগাস্টের ২৬ তারিখ সে ফিরে যায়।

সেখানে ফিরে যাবার পরে জেটল্যাগের কারণে বিছানাতেই শুয়ে বসে কাটছিলো তার দিন। সেদিন বিকেলে একটু উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে। এরপর সামাল দিতে না পেরে ঘুরে পড়ে গেলো সে হঠাৎ করেই। আমাকে জানালো তার অসুস্থতার কথা। আমার তখন কেবল ভোর হয়েছে।

আমি চিন্তাগ্রস্ত হয়ে তাকে ডাক্তারের কাছে যেতে বললাম। পরামর্শ নেবে বলে প্রথমেই সশরীরে গিয়ে নোটিশ করলো স্থানীয় মেডিক্যাল সেন্টারে। সেখানে অফিস সময় শেষ বলে তারা ওকে দেখেনি। এরপর সে চলে যায় কাছাকাছি একটি ক্লিনিকে। সেখানেও ডাক্তার ছিলো না বলে নার্স তাকে এক্সামিন করে। ব্লাডপ্রেসার খুব লো(৮০/৪০) ছিলো সেদিন।

ফার্মেসীর এক বিক্রেতার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র নিয়ে সে ঘরে ফেরে। ফার্মাসিস্টের পরামর্শে সেই সময় সে বেশি করে জুস আর লবন পানি খায়। পরের দিন সে রক্ত পরীক্ষা করে এবং বুকের এক্সরেও করে ফিজিশিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী। রিপোর্ট পায় বেশ কয়েকদিন পরে।

ইতিমধ্যে সে অনেকটা সুস্থ হয়। ডেংগুতে ভুগছিলো কিনা এটা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। ধীরে ধীরে অসুস্থতা থেকে সেরে উঠে আমার মেয়ে। আমি দুর থেকে দোয়া করি আর ভাবি, সামনের বছর ডেংগুর সময়ে তার দেশে না আসাই সমীচীন হবে। তখনো জানা ছিলো না সারা পৃথিবীর জন্য কি ভয়াবহ বিপদ ঘনিয়ে আসছে সামনের দিনগুলোতে।

অগাস্ট মাসে কাব্য রেজাইনাতে ফেরার পর পরই অন্য হাউজে স্থানান্তরিত হয় আনিকা নামের বাসামেট। সেই সময় দুজন নতুন মেয়ে আসে। নেহা নামের মেয়েটি কাব্যের চাইতে সিনিয়র হলেও সহপাঠী হিসেবে ভর্তি হয়েছে ইউনিভার্সিটিতে। করোনা অভিজ্ঞতায় ‘নেহা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। সেজন্যই তার কথা লিখছি প্রাসংগিকভাবে।

২০১৯ এর ডিসেম্বরে করোনা রোগ প্রথমবারের মতন সনাক্ত হলেও ২০২০ সালের জানুয়ারীর শেষদিকে আমরা প্রথম জানতে পারি যে করোনা নামক ভাইরাস অনেক মানুষের মৃত্যু ডেকে এনেছে চায়নার উহান প্রদেশে। এটি সারা বিশ্বে ছড়াবার কোন ইংগিত তখনো পাইনি।

মেডিক্যাল কলেজের বন্ধু হাবিবা আর সাকি তখন দেশে বেড়াতে এসেছে। মেয়েকে অল্প কদিন আগেই ওমান থেকে মালোয়শিয়াতে পড়তে পাঠিয়েছে বন্ধু সাকি। ইতিমধ্যে শুনেছি ইটালিতে ছড়িয়েছে করোনা। করোনার কারণে ইউনিভার্সিটি ছুটি দেয়া হয়েছে মালোয়শিয়াতে। ওর মেয়ে চলে এসেছে বাসায়। আগেভাগেই তাই সাকি ফিরে যাচ্ছে ওমানে।

এম ২৪ এর গেট টুগেদারে সাকি থাকতে পারবে না বিধায় আমি উদ্যোগ নিয়ে ৩রা ফেব্রুয়ারী তার সাথে দেখা করি। আমরা এলিফ্যান্ট রোডে অবস্থিত স্টার এ বসে লাঞ্চ সারি। এরপর সাকি আর আমি একসাথে মেলায় আসার জন্য রওনা হই রিকশাযোগে।

এসময়ে দেশে মাস্ক সংকটের দৃশ্য চোখে পড়ে। শাহবাগ এলাকায় কোন ফার্মেসীতে মিলছিলো না মাস্ক। তখনো অসচেতন ছিলাম এই ব্যাপারে। পুরো মেলায় মাস্ক ছাড়াই ঘুরে বেড়িয়েছি খোলা প্রান্তরে মানুষের ভীড়ে। তখনো সেই ভাইরাস সংক্রমন শংকার কারণ হয়নি আমাদের এই শহরে।

কিন্তু একটা অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রশ্নবোধক হয়ে গেঁথে যায়। আবৃত্তির শিশুশিল্পী রাজশ্রীর ভাই রিকির অস্বাভাবিক মরণ খুব তোলপাড় তোলে আমার মনে। কি হয়েছিলো বাচ্চাটার? কোন সদুত্তর পাইনি সেই প্রশ্নের। তবুও সময়ের সাথে সেই ঘটনাও ফিকে হয়ে যায়। বাবা মায়ের আর্তনাদ ছাড়া আর কোন বার্তা তখন মনের কোণে উঁকি দেয়নি।

সে তার জীবন দিয়ে আমাদের সাবধান করতে চেয়েছিল কিনা, সেটা উপলব্ধি করা হয়নি। পেন্সিল আর বইমেলার সমস্ত উৎসব শেষ হতে থাকে আমাদের অসতর্ক মানসিকতা নিয়েই। ফেব্রুয়ারীর শেষ দিন অবধি আমার আশপাশ সহ আমি একটি বিষয়েই নিমগ্ন ছিলাম। সেটি হলো বইমেলার বই।

লেখক-ডাঃ নিবেদিতা নার্গিস
এফ.সি.পি.এস,এম.ডি
সহযোগী অধ্যাপক এবং হেড অফ ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট
জাপান ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
আইচি নগর, উত্তরা, ঢাকা।

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!