ব্রেকিং

x

করোনাকালে ক্রিটিকাল কেয়ারঃ আট

আম্মার সার্জারি আর আব্বার মৃত্যু

রবিবার, ০৯ মে ২০২১ | ৮:৫৬ অপরাহ্ণ | 560 বার

আম্মার সার্জারি আর আব্বার মৃত্যু
ডাঃ নিবেদিতা নার্গিস

ব্লাড সুগার বেশি থাকায় আম্মার সার্জারি করতে একদিন বিলম্ব হয়। সবিনয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সাহানা পারভীন ম্যাডামের প্রতি যিনি বিশেষ যত্নে আম্মাকে অপারেশন করেছেন। শুরু থেকেই তার এপ্রোচ আমাকে অভিভুত করেছে। এককভাবে ডাঃ সাহানা জরায়ুর ইনভলভমেন্টের ব্যাপারে কনফিডেন্ট ছিলেন। অথচ আম্মার হিস্ট্রি, ক্লিনিক্যাল ফিচার, আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট সবকিছু ছিলো ওভারির পক্ষে। তবে ইউটেরাস বা ওভারি যেখানেই হোক খুব বেশী কিছু করা যায়নি আম্মার ক্ষেত্রে। তবু প্যালিয়েটিভ এই চিকিৎসাটুকু খুব দরকার ছিলো আম্মার।অপারেশন পরবর্তী সময়ে আম্মা আলহামদুলিল্লাহ ভালো ছিলেন । ব্লাড সুগার টাইট কন্ট্রোল করা হয়েছে ইনসুলিন দিয়ে। লম্বা করে পেট কাটা হয়েছে বলে পেথেডিনের মাধ্যমে ব্যথা নিরাময় করা হয়েছে। অপারেশন আন ইভেন্টফুল হওয়ায় আমি সন্তুস্ট। শ্বাস প্রশ্বাসে খানিক সমস্যা হওয়ার কারণ সার্জারির জন্য বড় করে ইনসিশন দিতে হয়েছে।নেবুলাইজেশন করা হয়েছে। অক্সিজেনও দিতে হয়েছে। ডাইইউরেটিক দিয়ে ফুসফুস থেকে অতিরিক্ত পানি সরানো হয়েছে। পোস্ট অপারেটিভ পিরিয়ডে সুগার নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। এক রাত্রি ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ায় সুগার বেড়ে গিয়েছিলো। সাতদিন টানা আম্মার সাথে ছিলাম ডেল্টায়। এরমধ্যে চারদিন ওখান থেকেই উপস্থিত হয়েছি কর্মস্থলে।


অতঃপর সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ আম্মাকে রিলিজ দেয় হাসপাতাল। বলাবাহুল্য, নিবিড় পরিচর্যার জন্য আম্মাকে আমি নিজের বাসায় নিয়ে এসেছি। আম্মাও এতে স্বস্তি অনুভব করেছেন। এসময়ে আব্বাকে দেখে রেখেছে আমার ভাই মুন্না আর ভাই বউ লিজা। আম্মার অভাবে আব্বা তখন বেশ অসহায়। আম্মাকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলেন আব্বা। হয়তোবা খুব ভয় পেয়েছিলেন। স্বল্পভাষী বাবা সেই ভয়টুকু সেভাবে প্রকাশ করতে পারেন নাই। ২৪ তারিখ আব্বার কাছে একবার এসে সুগার চেক করি। শারিরীক অবস্থা মোটামুটি ভালো ছিলো সেদিন। তবে উনি বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। ছোটবোন খনার কাছে আম্মাকে দেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও আমাকে সে সম্পর্কে কিছু বলেন নাই। আমি তাকে আস্বস্ত করে ফিরে আসি আমার বাসায়। পরদিন ক্লাস রেডি করে মেডিক্যাল অফিসারদের সাথে জুমে বসি। লুজ মোশন হচ্ছিলো আব্বার। গোসল করিয়ে দেয়া হয়েছে জুম্মাবারে। আশ্চর্যজনক ভাবে পরবর্তী বারোঘন্টায় আব্বার ডায়াপার পরিচ্ছন্ন ছিলো। ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে মুন্না আব্বার অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে ভয় পেয়ে রিং করে। আমিও তড়িঘড়ি করে রিকশা নিয়ে চলে যাই আব্বার কাছে। হাত পা ঠান্ডা ছিলো, ঘেমে গিয়েছেন এবং মুখ দিয়ে গোংগানির মতো অস্বাভাবিক আওয়াজ করছিলেন।


হাইপোগ্লাইসেমিয়া মনে করে চিনির পানি খাওয়াই। লিজাকে পাঠাই কলেরা স্যালাইন আনার জন্য। গ্লুকোমিটারটাও সে নিয়ে আসে আমার বাসা থেকে। ব্লাড সুগার পাই ১৩.৮. আব্বার জ্ঞান ফিরে আসে দ্রুতই। ইতিমধ্যে খনা আর শোভন বাসায় এসেছে। আমার হাজবেন্ডও চেম্বার থেকে চলে আসেন। আব্বার কাছেই বসে দোয়া করতে থাকি। আব্বা কয়েকবার কালেমা পাঠ করেন। আম্মার অনুপস্থিতির কারণে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ভেবে আম্মাকে নিয়ে আসি নয় নম্বরে। আব্বা আম্মাকে দেখতে পেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ‘আমার চুনী,আমার চুনী’ বলে আম্মাকে কাছে ডাকেন। আম্মা মুখে,মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। আম্মার কাছে মাফ চান আব্বা। আম্মাও মাফ চাইলেন। একে একে ছেলে মেয়েদের কাছেও মাফ চাইতে থাকেন। সকলের কাছ থেকে এভাবে বিদায় নেয়ার ভাগ্য কজনের হয়! আম্মা খাওয়ার জন্য অনুরোধ করার পর আব্বা ভাত খেতে রাজি হন। শিং মাছ দিয়ে জাউ ভাত মুন্না চামচ দিয়ে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। সবটুকু খাবার শেষ করেন। এরপর পানিও খান পর পর তিন বার। এরপর আব্বা বার বার ডান কাত হয়ে বালিশ ছেড়ে নেমে যাচ্ছিলেন। আমি আর মুন্না তাকে চিত হয়ে থাকার জন্য বলি। একসময় মনে হলো উনি বেশ ভালো আছেন। খনা চলে যেতে উদ্যত হয়। আমি মানা করি। কেন জানি মন বলছিলো আজকে রাতেই কিছু ঘটে যেতে পারে আব্বার। হাসপাতালে নেয়ার চেস্টা করিনি।

মনে হচ্ছিলো আমাদের সবার মাঝখানে দোয়া দরুদের মধ্যেই উনি থাকুন। এগারোটা নাগাদ আমাদের মনে হলো উনি ঘুমিয়েছেন। এসময় মুন্না আমাকে বিশ্রাম নিতে পাঠিয়ে নিজে পাশে বসে রইলো। সাথে লিজা। আমিও ক্লান্তিতে চলে গেলাম অন্যঘরে। শ্বাস নিচ্ছেন না দেখে মুন্না আবার চিৎকার করে আমাকে ডাকে। আব্বা এসময়ে চলে যান অন্তীম যাত্রায়। ইন্না-লিল্লাহে ইন্না ইলাইহে রাজেউন। রাত পৌনে বারোটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।আমার প্রিয় পিতার এহেন মৃত্যুতে আমি প্রথমে দিশাহারা হই। এরপরই আল্লাহর দরবারে শোকর করি। আল্লাহর রহমতে তিনি ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে বিশ্বাস করি। আল্লাহ মেহেরবান। আব্বার মৃতদেহ উত্তর দক্ষিণ মুখি করে রাখা ছিলো লিভিং রুমে। সারারাত খনা পায়চারী করেছে এঘর আর ওঘর। আম্মা কান্নাকাটি করেছেন। আমি আর লিজা ঔষধ খেয়েছিলাম বলে ঘুমিয়ে গেছি। সকালে গোসল করানো হয়। সাতটায় আমরা বাড়ির পথে রওনা হই। মুন্না আর কবির ছিলো লাশবাহী গাড়িতে। জানাজা আর দাফন সম্পন্ন করা হয় বাদ জোহর।

আত্মীয়দের উপস্থিতিতে আবেগে ভেসেছি। সৈয়দপুর আর সুনামগঞ্জ থেকে চাচাতো ভাইদের চলে আসাতে উপলব্ধি করেছি,আব্বা সকলের কাছে কতটা শ্রদ্ধার ছিলেন। সকলের বক্তব্য শুনে মন শান্ত করে ফিরে এসেছি আম্মার কাছে। বাড়িতে এতো লোক সমাগম ছিলো তবু সকলকে ফেলে অসুস্থ মায়ের কাছে ফিরে এসেছি গভীর রাতে।আমার বাবার প্রিয় সন্তান আমি। আমিও বাবাকে বেশি ভালোবাসি। এমন আপন মানুষকে হারিয়ে আমি অনেকটাই রিক্ত হয়ে গেছি। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসীব করুন,আমিন। রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানী সাগিরা।

লেখক-ডাঃ নিবেদিতা নার্গিস
এফ.সি.পি.এস,এম.ডি
সহযোগী অধ্যাপক এবং হেড অফ ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট
জাপান ইস্ট ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
আইচি নগর, উত্তরা, ঢাকা।

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!