ব্রেকিং

x

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্থ স্কুলে আতঙ্ক,

শুক্রবার, ০৪ জানুয়ারি ২০১৯ | ৮:৫২ অপরাহ্ণ | 695 বার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্থ স্কুলে আতঙ্ক,

মাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে এসে বই নিলো মো. আজিম মিয়া। মঙ্গলবার বই উৎসবের দিনে কেন আসে নি জানতে চাইলে বলল, ‘ডরে আইছি না। যেই কাইজ্জা অইছে। আজকা আম্মারে লগে লইয়া আইছি।’ পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া আজিমের মা ইয়াছমিন বেগম জানান, বিদ্যালয়ে ভাঙচুর চালানোর কারণে তাদের মনেও অনেক আঘাত লেগেছে।
পঞ্চম শ্রেণির কক্ষে বসে থাকা নিজাম, আহম্মদ, মামুন, আরিফসহ আরো অনেকে একই সুরে তাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করার কথা জানিয়ে বলল, ‘আমডার বোডের (স্টুডেন্ট কাউন্সিল) সম তো কোনো কাইজ্জা অয়না। বড়রা মারামারি কইরা আমডার ইস্কুলডারে বাংছে। ক্লাশ করতে আমডার অহন অসুবিধা অইব।’
নির্বাচনী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্থ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার রাজঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বুধবার সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। সবার মনেই বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ‘ক্ষত’। অচিরেই বিদ্যালয়টি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন তাঁরা।
রাজঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট কেন্দ্র ছিল। ভোটের দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী র. আ. ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এম.পি ওই কেন্দ্রে গেলে অতর্কিত হামলা হয়। সংসদ সদস্য কোনো রকমে রক্ষা পান। হামলায় বিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষের দরজা, জানালা, টেবিল ভাঙচুরসহ ব্যাপক ক্ষতি করা হয়। এ সময় গুলিতে মো. ইসরাইল মিয়া (১৪) নামে এক নির্মাণ শ্রমিক নিহত হন। ইসরাইল ওই গ্রামের সাঈদ মিয়ার ছেলে।
বিএনপি নেতা-কর্মীরা এম.পি’র উপর হামলা করে বলে অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য নিহত ইসরাইলকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই পক্ষই নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছে। ওই ঘটনার বিএনপি প্রার্থী খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলের পৌর এলাকার পুনিয়াউটের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের মধ্যে গুলাগুলি সময় ওই যুবক নিহত হয়। অন্যদিকে বিএনপি’র দাবি, পুলিশের গুলিতে ওই যুবক নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় ইসরাইলের পিতা সাঈদ মিয়া বাদী হয়ে সদর থানায় মামলা দায়ের করেন।
বুধবার সকালে ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের তিনটি ভবনের সব কয়টি কক্ষের দরজা জানালা ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অফিস কক্ষটি একেবারে তছনছ অবস্থায় পড়ে আছে। চতুর্থ শ্রেণির একটি কক্ষকে অফিস কক্ষ হিসেবে আপাতত ব্যবহার করা হচ্ছে। কয়েক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্থ আসবাবপত্র, টেবিল, দরজা-জানালা ইত্যাদি দেখছেন। বিদ্যালয়ের পাশেই হওয়া অস্থায়ী ক্যাম্পে বসে আছেন একদল পুলিশ।
কথা হয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। ভোটের দিনের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মনে একটা আতঙ্ক রয়েছে। আজ (গতকাল) পর্যন্ত মাত্র দুইজন শিক্ষার্থী শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে।’
তিনি জানান, হামলায় প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে দরজা, জানালা, চেয়ার, টেবিল, আলমীরাসহ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ রয়েছে। বিষয়টি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি বিদ্যালয়েই ছিলাম। হামলায় আমি নিজেও আঘাতপ্রাপ্ত হই। স্থানীয় লোকজন এম.পিকে কোনো রকমে রক্ষা করেন। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। অন্যথায় বড় ধরণের কিছু ঘটতে পারতো। হামলায় বিদ্যালয়ের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’
ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এম.পি’র উপর সেদিনের হামলাটি ছিল পরিকল্পিত। এম.পি ঢোকার পর পরই এত দ্রুত দেশীয় অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে আসাটা এটাই প্রমাণ করে। এখন এলাকার পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত।’
এদিকে রাজঘর গ্রাম ঘুরে সুনসান নীরবতা লক্ষ্য করা যায়। গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতে পুরুষ সদস্যরা নেই। বিদ্যালয়ের সামনের জমি পেরিয়ে ওইসব বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় নারীদের উপস্থিতি। জানালেন, গ্রেপ্তারের ভয়ে পুরুষ সদস্যরা বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
ইসরাইল মিয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামী মো. জহির মিয়ার ছোট ভাই মিস্টার মিয়ার স্ত্রী শরীফা আক্তার জানান, তাঁদের বাড়ির কে বা কারা মামলায় আছেন তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেন নি। তবে পুলিশি গ্রেপ্তারের ভয়ে পুরুষ সদস্যরা বাড়িতে থাকছেন না। বাড়িতে হামলার ভয়েও আছেন তাঁরা।
ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি মো. জামাল মিয়া বলেন, ‘স্কুল কেন্দ্রে ঘটনার সময় আমার বাড়িও আক্রান্ত হয়েছিল। বিএনপি’র লোকজন পরিকল্পিভাবে এম.পি’র উপর হামলা করেন। ঘটনার পর থেকে গ্রামের অনেকেই এখন পলাতক আছেন।’
রাজঘরের বাইতুন নুর জামে মসজিদের ইমাম বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে নামাজের সময় মুসুল্লিদের উপস্থিতি আগে চেয়ে অনেক কমে গেছে। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়ির পুরুষ সদস্য পালিয়ে বেড়ানোয় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’
নিহত ইসরাইলের বাড়িতে গিয়ে এক প্রকার শোকবাহ পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। ঘরের বাইরে বিমর্ষ অবস্থায় বসেছিলেন একাধিক স্বজন। মা সামিরুন বেগম জানান, ইসরাইল নিহত হওয়ার পর কেউ তাঁদের খোঁজ কেউ নেন নি।
হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়ার মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার এস.আই সুমন চন্দ্র দেবনাথ জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০ জন পুলিশ পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন। এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে। মামলার আসামীদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আখাউড়ানিউজ.কমে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিও চিত্র, কপিরাইট আইন অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে না।

Development by: webnewsdesign.com

error: Content is protected !!